1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

আছে কি কোনো মূলমন্ত্র? কেমন করে একটি দেশ ধনী হয়!

কেমন করে একটি দেশ ধনী হয়? আছে কি কোনো মূলমন্ত্র? সহজ কোনো উপায়? আমরা জানি, ধনী হওয়ার পথ খুব দীর্ঘ, বন্ধুরও বটে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ ব্রুনেই জনসংখ্যার তুলনায় তেল-গ্যাসের মতো মূল্যবান খনিজ কপালগুণে দেশটিকে ধনী করে দিয়েছে। দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুরে তেমন খনিজ সম্পদ নেই। দেশটি মালয়েশিয়া থেকে পানিও আমদানি করে খায়। সিঙ্গাপুরকে সমৃদ্ধির কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম, বন্দর বাণিজ্য এবং দক্ষতার জোড়ে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছে সিঙ্গাপুর। হিরোশিমার পারমানবিক বিধ্বংস কাটিয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ জাপানীরা অতি পরিশ্রমীর অপবাদ নিয়ে গড়ে তোলেছে সমৃদ্ধির সাম্রাজ্য। অনুপম আদর্শিক নেতৃত্বে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে আত্মবিশ্বাসী-আত্মশক্তিতে বলিয়ান হিসেবে জাতি গঠনের মাধ্যমে মালয়েশিয়াকে ধনের স্বর্গোদ্যানে পরিণত করেছেন মাহাথির মোহাম্মদ।

উদাহরণ দিলে এমন অনেক কিছুই বলা যাবে। উপার্জনমুখী গণজাগরণই জাতীয় উন্নয়ন রেনেসাঁর সূত্রপাতের মূলমন্ত্র। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিউদ্যোগ সৃষ্টি করে বৃহত্তর গণজাগরণ। এভাবে সমাজ উন্নয়ন ও পরিবর্তনে সামাজিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক উদ্যোগ মানুষের মনে উপার্জনমুখি প্রবণতা সৃষ্টি করে। কোনো সরকারের একক প্রচেষ্টায় দেশের আমূল পরিবর্তন আনয়ন অসম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারের কাজ সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করা। তাহলে- সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসবে অসংখ্য উদ্যোক্তা, সামাজিক নেতৃত্ব, বাড়বে বিনিয়োগ, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। সামাজিক উন্নয়ন তৎপরতার এই গণজাগরণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে।

নাম নিলুফার ইয়াসমিন। তিনি একজন গৃহিণী। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলার নাসিরাবাদ উপজেলার বিন্না গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকার জুড়াইনে ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রেতা স্বামীর উপার্জনে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হতো তার। টানাপোড়েনের জীবন সংসারে ভবিষ্যতের অনিশ্চিতযাত্রা ভাবিয়ে তুললো তাকে। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি- কিছু একটা করতেই হবে। ব্যস, যা চিন্তা তাই কাজ। স্বামীর পেশার ধারাবাহিকতাই তার স্বাবলম্বনের পথে আশার আলো জাগালো। নিলুফার ইয়াসমিন শুরু করলেন কাজ। ক্রিকেট-ব্যাট তৈরি করে বিক্রির ব্যবস্থা করলেন স্বামীর সহযোগিতায়। শুরু হলো দারিদ্র্যমুক্তির সংগ্রাম।

উদ্যোগ গ্রহণের পর তাকে আর পেছনফিরে তাকাতে হয়নি। বিন্না গ্রামে নিলুফারের কারখানায় এখন অনেক শ্রমিক কাজ করছেন। একজন গ্রামীণ নারীর সৃজনশীল উদ্যোগ বৈপ্লবিক পটপরিবর্তনের শুভ সূচনা করলো। তিন লাখ টাকার বেশি পুঁজি বিনিয়োগ আছে তার কোম্পানিতে। মাসে চার হাজার ব্যাট তৈরি হচ্ছে। নিলুফারের সাফল্য দেখে তাকে মডেল হিসেবে ধরে নিয়ে এ গ্রামেই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় আরো এক’শটি প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে প্রায় সাত শতাধিক লোকের। নিলুফার ইয়াসমিনের এ উদ্যোগ চোখ খুলে দিয়েছে এলাকাবাসীর। সবার চোখে-মুখে এখন স্বাবলম্বনের স্বপ্ন। স্বপ্ন সাফল্যের পথযাত্রী নিলুফার ইয়াসমিন অর্জন করেছেন ‘সিটি গ্রুপ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০০৬’।

কানাডার পূর্ব উপকূলে আটলান্টিক তীরবর্তী বরফে ঢাকা শহর হ্যালিফ্যাক্স থেকে সিটি গ্রুপ ফাউন্ডেশন আয়োজিত শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল উদ্যোক্তা পুরস্কার নিয়ে এলেন নিলুফার ইয়াসমিন। শুধু নিলুফার ইয়াসমিনই নন, এমন উদাহরণ খবরের কাগজে আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায়শই জানতে পারছি আমরা। এমন খবর আমাদের আশান্বিত করে। মনে সাহস যোগায়। সম্ভাবনার স্বপ্নকে জাগরিত করে তোলে।

সম্ভাবনা আমাদেরও আছে। বাংলাদেশ এখন এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জিডিপি অর্জনকারী দেশ। আমাদের উচিত কথা কম বলে কাজ বেশি করা। বিদ্যমান সমস্যা মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে হবে। দেশ গড়তে তরুণ সমাজকে প্রযুক্তি জ্ঞান সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগরণ ঘটাতে হবে। বিজয় অর্জন ও স্বাধীনতা অর্জনের ৪০ বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একটি স্বাধীন দেশে ৪০ বছরে যে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিলো তার কিছুই হইনি। তবুও এগিয়ে চলেছে দেশ আপন গতিতে। আমরা সম্ভাবনাময় দেশটিকে জাগিয়ে তোলতে পারিনি। পরের কথায় কান দিয়ে নিজেদের সম্ভাবনাগুলোকে ধ্বংস করেছি অবলীলায়।

আমরা যে যে পেশায় নিয়োজিত রয়েছি সেখানটায় থেকেই অনেক কিছুই করার আছে দেশের জন্য। দেশকে অনেক কিছুই দেওয়ার আছে। তিনটি পেশাকে বলা হয়ে থাকে সেবামূলক। পেশা তিনটি হলো- ডাক্তার, শিক্ষক এবং শিল্পী। আমাদের দুর্ভাগ্য এই সেবামূলক পেশাজীবিরা চরম অনৈতিক, অর্থলিস্পু হিসেবে এখন অভিযুক্ত। শুধু তারাই নন, জাতির বিবেক সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে সকল পেশায় ও কর্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে দুর্নীতি আর অনিয়ম। রাজনীতিতে তো আদর্শের ছিটেফোটাও নেই।

একটি দেশের জন্য সবার আগে প্রয়োজন কিছু ভালো মানুষ। দরকার দেশপ্রেমী প্রত্যয়। এখানটাও আমাদের অনেক ঘাটতি আছে। দেশকে ভালবাসতে না জানলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রজন্ম তৈরি হবে না। সৎ, যোগ্য নেতৃত্বও আসবে না।এখন প্রয়োজন ভিশনারি নেতৃত্ব। দেশের সম্পদ-সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। জাগিয়ে তুলতে হবে শিল্প সম্ভাবনা। দেশের উদ্যোক্তাদের অধিক সুবিধা আর কাজের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশের মানুষই দেশ গড়বে। সুতরাং মানুষের জন্য ব্যাপক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত।

বিপুল সম্ভাবনাময় আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ। জনসংখ্যাবহুল এদেশটির স্বাধীনতা অর্জনে রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। আমরা বাঙালি, বীর বাঙালির সুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে। ভাষার জন্যে আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশেরই আছে। স্বদেশি স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত বাঙালি জনতার ভাষার জন্য সংগ্রামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আজ বিশ্বে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে গৌরবান্বিত আমরা। আমাদের সভ্যতায়, অস্তিত্বে মূহ্যমান বাংলার সংস্কৃতি। আমরা বাংলাদেশি। আমাদের ত্যাগ, আমাদের সংগ্রাম আগামি দিনের সমৃদ্ধির সোপান। আমাদের যেমন আছে সমস্যা, তেমনি আছে সম্ভাবনা। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় আর স্বাধীনতা অর্জনের পর আরো একটি অর্জন বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে নতুনভাবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন। বিশ্বে সম্মানের আকাশ যেন ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। জাগরণের আরেক নতুন মাত্রা। জেগে উঠেছে অন্য আরেক বাংলাদেশ। গর্ব করার মতোন অর্জন আছে আমাদের। আবারো প্রমাণিত হয়েছে আমরাও পারি।

বাংলাদেশ থেকে দুইশ পঞ্চাশ গুণ বড় একটি দেশের নাম অস্ট্রেলিয়া। দেশটিতে পর্যাপ্ত পানি নেই। জর্জিয়ায় একশ কিলোমিটারের মধ্যে দুই বা তিন জন মানুষ দেখতে পাওয়া যায়। ওখানে গাছের ফল নিচে পড়ে থাকলেও তা কুড়িয়ে বিক্রি করার মতোন মানুষ নেই। তুলনা করলে দেখা যায় কত না সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ আমাদের বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই বাংলাদেশ। কী নেই এখানে? আছে প্রাকৃতিক সম্পদ, পানি, গ্যাস, কয়লা। বাংলাদেশের মাটিতে অবলীয়ায় ফলানো যায় সোনার ফসল। আমাদের রয়েছে বিপুল জনশক্তি, আছে সস্তা শ্রম। আমাদের আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি যুবশক্তি। যুবারাই হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। চীন শুধু জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধির শিখরে উঠেছে। আমাদের জনশক্তি পৃথিবীর বহুদেশে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখছে। আয় হচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। বেকারত্ব, দুর্নীতি, দারিদ্র্য, অনিয়ম, অস্থিরতা যেন ঘিরে রেখেছে উন্নয়নের পথ। তারপর ধীর গতিতে হলেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার অর্জনের ৪৭ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ। আমরা ঠিকই এগিয়েছি অনেকদূর। কিন্তু যতটা এগুবার কথা তার ধারে-কাছেও এখনো যেতে পারেনি। সময় ফুরিয়ে যায়নি, সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। সম্ভাবনা আরো বেড়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে সে আশার প্রদীপ জ্বেলে বসে থাকলে চলবে না। সবাইকে একযুগে কাজ করে যেতে হবে। জাতীয় ঐক্য, সমবেত প্রচেষ্টায় কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। আসুন দেশকে ভালোবাসি, দেশের জন্য কাজ করি।

এস এম মুকুল: বিশ্লেষক

 

আরো পড়ুন