1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:০২ পূর্বাহ্ন

এই বছর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পা দিয়েছো,মূলত তোমাদের উদ্দেশ্যেই লেখাটি।

নতুন বছর শুরু হয়ে গেল। আর এর সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণা। যারা এই বছর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পা দিয়েছো, সবাইকে প্রথমেই অনেক অনেক অভিনন্দন। এই পোস্টটা মূলত তোমাদের উদ্দেশ্যেই। তবে যারা সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর জগতে পা দিতে যাচ্ছ, তারাও পড়তে পারো। একটা কথা ভাল লাগলে সেটাও অনেক বড় একটা প্রাপ্তি।

বেশ কিছুদিন ধরেই একটা মজার ব্যাপার দেখে আসছি। ফেসবুকের বিভিন্ন এডমিশন ভিত্তিক পেজগুলো ঘাঁটলে এখন একই রকম কিছু প্রশ্ন অনেক বেশি দেখা যায়, কিন্তু এগুলোর কোন পরিপূর্ণ উত্তর কাউকে দিতে দেখি নি। বরং অনেকেই এসব প্রশ্ন করতে গিয়ে হয়েছে বাকিদের হাসি ঠাট্টার শিকার। এমনকি আমাকেও এরকম ধরনের বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেকবার পার্সোনালি। প্রশ্নের ধরনগুলো অনেকটা এ রকম,

“আমি কোন পাব্লিক ভার্সিটিতে চান্স পাই নি, এখন প্রাইভেটে পড়লে আমি ফিউচার এ কি চাকরি পাব? ”

“আমি অমুক সাবজেক্টে পড়ি, অনেকের কাছে শুনেছি এই সাবজেক্টে পড়লে চাকরির জন্য সারাদিন রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগে। আমি এখন কি করব? ”

“আমি অমুক পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুক বিষয় পেয়েছি। এখন আমার কি কোন প্রাইভেটে আরো ভাল কোন সাবজেক্টে ভর্তি হওয়া উচিত? সবাই বলে, প্রাইভেটে পড়ার চেয়ে পাব্লিকের সবচেয়ে খারাপ সাবজেক্টে পড়াও ভাল। এই কথাটা কি সত্যি? ”

আমি নিজে খুব বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ নই। তবে আমি আমার বাস্তব জীবন আর পারিপার্শ্বিকতা থেকে যা যা শিখেছি, সেটা একটু শেয়ার করার চেষ্টা করব। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি যা যা শিখেছি তার মধ্যে খুব সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দুটি শব্দ, “Passion” এবং “Network” ।

প্রথমে আসি “Passion” এর ব্যাপারে। আমি আমার নিজের অনেক বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র অনেককেই দেখেছি যারা বিশেষ বিশেষ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়াটা কেই জীবনের সব ধ্যানজ্ঞান হিসেবে মনে করত। অবশ্য বাকিদের কথা কি বলব, আমি নিজেও অনেকদিন ছিলাম কিছুটা এই রকম। চিন্তাটা অনেকটা এরকম, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই সাব্জেক্টেই চান্স পাই না কেন, সেটা যত বাজেই হোক না কেন, সেখানেই পড়তে হবে। অনেককেই দেখেছি ভার্সিটি গ্রাজুয়েট হবার পরেও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে না পারার কারণে আফসোস করতে।

আমরা অনেক অনেক বেশি দুর্ভাগা একটা জেনারেশন এর অংশ, যেখানে বেশিরভাগ তরুণদের “Passion” এর জায়গায় এটা থাকে না যে, “ভার্সিটিতে কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়ে নিজের ক্যারিয়ার বিল্ড আপ করব? “, বরং “Passion” এর জায়গাটা হল, “কোন ভার্সিটি তে পড়াশুনা করব? সাবজেক্ট দিয়ে কি হবে, ভার্সিটিই তো আসল!! ” এটার ফলাফল কিন্তু ভয়াবহ। গতকাল একটা স্বনামধন্য পেপারে একটা লেখা পড়লাম, আমাদের দেশে সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত পর্যায়ে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। যেখানে “এসএসসি পাশ”- এই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭%, সেখানে “অনার্স পাশ”- এই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণেরও বেশি, ১৬%। অনেকেই এটার জন্য চাকরির অভাব কে দায়ী করে যেটা প্রায় পুরোপুরি সত্য, তবে এই দোষারোপের কারণে অনেক বড় একটা সমস্যা আড়ালে চলে যায়। সেটা হল, এই বিশাল সংখ্যক ডিগ্রীধারীদের মধ্যে বেশিরভাগেরই চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা বা স্কিল এর অনেক বেশি অভাব। নিজ চোখেই দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর অনেকেরই নতুন কিছু শেখার বা করার আগ্রহটা অনেক কমে যায়। ভাবনাটা এমন, একটা ডিগ্রী নিয়ে বের হতে পারলেই হল, বাকিটা পরে দেখা যাবে। এক্ষেত্রে পাবলিকে পড়ুয়াদের চিন্তা থাকে, “পাবলিকে পড়ি, চাকরির আবার অভাব হবে নাকি? এত পড়াশুনার কি দরকার, আমার সারাজীবন ইচ্ছা তো পূরণ হয়েই গেসে। ” আর পাবলিকে চান্স না পাওয়াদের ভাবনা থাকে, “ভাল কোথাও তো চান্স পেলাম না। ভার্সিটির পড়া পড়ে কি হবে? চাকরি তো আর পাব না। তার থেকে কোন রকমে পাশ করে বিসিএস দেই। ওটাই আশা, ওটাই ভরসা। ” আবার এমনও অনেকে থাকে, যারা নিজের সাবজেক্ট টা একটুও এনজয় করে না, তাই খুবই দ্রুত তলিয়ে যায় ডিপ্রেশনে। ইয়ার ড্রপ, লেভেল ড্রপ, ভার্সিটি ড্রপ এর মত ভয়াবহ ব্যাপারগুলো ঘটতে থাকে তখনই।

এর ফলে কি হয়? ৪ বছর ধরে একটা জোস সাবজেক্টে ডিগ্রী নিয়ে তার ওই সাবজেক্টের স্কিলের ভান্ডার হয় শুন্য। সব জায়গায় চাকরির আবেদন করতে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়, আর দোষ দিতে থাকে দেশের চাকরির বাজারকে। পুরো ব্যাপারটা সারমর্ম করে একটা কথাই বলব, তুমি যেই ভার্সিটি-তেই পড় না কেন, প্রোফেশনাল লাইফে স্কিল না থাকলে তুমি চাকরিদাতাদের কাছে একটা মাকাল ফল ছাড়া কিছুই না। আমি নিজে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট, অনেকের কাছে পরম পুজনীয় বস্তু হয়ত। কিন্তু টু বি অনেস্ট, পাশ করার পর বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়েই বুঝতে পারসি, জ্ঞান আর দক্ষতা না থাকলে চাকরির বাজারে আমি একেবারেই useless একজন, আমার এই বুয়েট ট্যাগের একফোঁটা বেলও নাই। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য।

মোটা দাগে তাই একটা কথাই বলব, কখনোই কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তোমার জীবনের “Passion” হিসেবে মনে করা যাবে না। বরং তোমার “Passion” হবে তুমি কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনা করছো সেটা। এই “Passion” টাই তোমার স্কিল আর দক্ষতা বাড়ানোর পথে হাজার হাজার ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। সাবজেক্ট চয়েসের ব্যাপারে নিজের “Passion” বুঝতে পারাটা অনেক অনেক বেশি সেন্সিটিভ। আমি নিজের অনেক সম্ভাবনাময় বন্ধুকেই দেখেছি কাছ থেকে, যারা ভার্সিটিতে নিজের পড়ার সাবজেক্ট টাকে উপভোগ না করার জন্য, সাবজেক্টের প্রতি “Passion” না থাকার জন্য নিজেদের লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে, স্বাভাবিক জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আর সে জন্যই আমার ভার্সিটি লাইফের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল “Passion” নামের এই শব্দটা।

এখন আসি শেষ অংশে, মানে হল “Network” । আমরা বাঙ্গালীরা চাকরি জীবনে “Network” বলতেই বুঝি “মামা চাচার জোর”। অনেকেই হয়ত এখন ভাবছো, আচ্ছা মানলাম যে আমি ভার্সিটি লাইফে অনেক বেশি স্কিল অর্জন করলাম, কিন্ত আমার তো কোন মামা-চাচা নাই। আমি কিভাবে চাকরি পাব? আমি তো প্রাইভেটে পড়ি। বেশিরভাগ বড় বড় কোম্পানী গুলো তো দেখি পাবলিক ভার্সিটি গুলো থেকে সরাসরি হায়ার করে, আমার ভার্সিটিতে তো কেউ আসে না। আমি তো জানতেই পারব না তাদের জব সার্কুলার গুলোর কথা। কি লাভ হল এত স্কিল দিয়ে???? আমার প্রথম কথা হল, তোমার যদি আপন মামা-চাচা নাও থাকে, মামা-চাচা তোমার নিজেরই বানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু কীভাবে??? দ্বিতীয় কথা হল, পাবলিক ভার্সিটি থেকে যেসব কোম্পানী হায়ার করে, একটু বুদ্ধি খাটালেই তুমিও সেখানকার জব সার্কুলার গুলোর ব্যাপারে সবসময়ই জানতে পারবা। কিন্তু কিভাবে????

দুটি প্রশ্নের উত্তরই একই, সেটা হচ্ছে ভার্সিটি লাইফে প্রচুর পরিমাণে নেটওয়ার্কিং করা। এর মানে কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং না, এর অর্থ হল প্রচুর পরিমাণে নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া, তাদের সংস্পর্শে আসা। তোমার সাবজেক্টের সাথে জড়িত বিষয়ে পড়াশুনা/চাকরি করছেন, প্রতিনিয়ত এমন সিনিয়র ভাইয়া আপুদের সাথে পরিচিত হও। সেটা আবার কেমন করে করব?? ভার্সিটির ফেস্ট/ক্লাব এক্টিভিটি গুলোতে ভাল করে অংশ নাও, সহজ বাংলায় প্রচুর পরিমাণে কামলা খাটো। এর পাশাপাশি এখন বাংলাদেশে ভার্সিটি লেভেলে প্রচুর কম্পিটিশন হয়, স্বেচ্ছাসেবক অনেক কার্যক্রম হয়। কিছু পারো বা না পারো, এগুলো তে অংশ নাও। এতে যেমন নিজের স্কিল বাড়বে, পাশাপাশি নিজের ডোমেইন এবং ডোমেইন এর বাইরের অনেক সিনিয়রদের সাথে পরিচয় হবে। তাদের কে নিয়ম করে সপ্তাহে সপ্তাহে ফোন দাও, ট্রিট নেওয়া আর বিয়ের দাওয়াত দেওয়া নিয়ে বেশি বেশি করে জ্বালাও, বাসায় গিয়ে পড়ে থাকো। এই ব্যাপারটা যদি খুব ভাল করে মেইন্টেইন করতে পারো, তাহলে পাশ করার পর তোমার মামা-চাচা-ফুপা কোনটার কোন অভাব হবে না। কিছুক্ষণ আগেই বললাম, অনেক কোম্পানী সরাসরি কিছু পাবলিক ভার্সিটি থেকে হায়ার করে। এটা অনেক দিক থেকেই সত্যি।

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। আমরা বুয়েট থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগে থেকেই প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমরা বিভিন্ন জব সার্কুলার এর খোঁজ পেতাম আমাদের ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপগুলোতে। এই দিক থেকেই স্বীকার করব যে, পাবলিক ভার্সিটিতে পড়লে এই সুবিধাটা আসলেই অন্যদের থেকেই বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু, ওই যে তোমার নেটওয়ার্ক। ওটা যদি স্ট্রং থাকে, তাহলে তুমি তোমার পাবলিক ভার্সিটির বন্ধুদের চেয়েও অনেক অনেক বেশি জব সার্কুলার এর খোঁজ পাবে। পরিচিত খুব কাছের কিছু বন্ধুকেই দেখেছি বিভিন্ন প্রাইভেট থেকে পাশ করার সাথে সাথেই Unilever, British American Tobacco, Robi, Grameenphone এর মত বড় বড় National এবং Multinational জায়ান্ট কোম্পানী গুলোতে চাকরি করতে শুধুমাত্র এই নেটওয়ার্ক টা থাকার কারণে। অপরদিকে পাবলিক ভার্সিটির অনেক বন্ধুকেই দেখেছি চাকরির অভাবে বেকার ঘুরাঘুরি করতে, শুধুমাত্র এই “Network” এর অভাবেই। আর এটা থেকেই গ্র্যাজুয়েশন শেষে আমার আরেকটা শব্দ খুব বেশি প্রিয়, সেটা হল “Network”।

অনেক কিছু বলে ফেললাম। এক বাক্যে যদি শেষ টানতে চাই, তাহলে একটা কথাই বলব, ভার্সিটি লাইফটা হচ্ছে রূপান্তরের সময়, খোলস থেকে বেরিয়ে আসার সময়। আমি মাঝে মাঝে নিজেকে দেখেই বারবার অবাক হই, যে কলেজ লাইফের আমি আর ভার্সিটি লাইফ শেষে আমি এই দুইজন কীভাবে এক মানুষ হল? দুইজনের মধ্যে তো আকাশ পাতাল তফাৎ। কিন্তু এটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই, কারণ আমি নিজেকে নতুন করে চিনতে শিখি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই। তাই এখন বেশি বেশি করে এক্সপ্লোর করো, ঘরে বসে মুখ গুঁজে থাকলে তোমার মত বড় Loser কেউই হবে না। নিজের সাবজেক্ট এর প্রতি “Passion” ধরে রেখে নিজের দক্ষতা বাড়াও, সিনিয়রদের সাথে “Networking” করো আর বেশি বেশি করে উপভোগ করো। জীবনের শুরু তো এখানেই। 😀

Shadman Majid

Department of CSE

BUET

আরো পড়ুন