1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:০০ পূর্বাহ্ন

কুয়েটের ছাত্রদের জানা অজানার গল্প!

ফার্স্ট সেমিস্টারটা খুব সুন্দর ছিল। আমরা সবাই মেসে থাকতাম, দুইবেলা ভাত এবং র‍্যাগ খাইতে হলের ডায়নিং রুমে যাইতাম। আমাদের সবাই একটা করে পানির বোতল নিয়ে হলের ডায়নিং এ আসত। সেই বোতলে পানি ভরে আমরা হেঁটে হেঁটে মেসে ফিরতাম। মাঝেমাঝে সেই বোতল চুরি হয়ে যাইত, একজনের ভরা বোতল আরেকজন নিয়ে যাইত। একেকজনের মেস ছিল একেদিকে। ক্যাম্পাস থেকে বের হইলেই অন্ধকার, শুনশান নীরবতা, ভয়ংকর ঝি ঝি ডাকার শব্দ। পুরাটা একদম গ্রাম একটা এলাকা। একদিন সন্ধ্যায় আমাদের কয়েক বন্ধু বাবার দোয়া হোটেলের পিছনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে র‍্যাগের ভয়ে লুকায়ে সিগারেট খাচ্ছে। হঠাৎ ধস করে বিকট একটা শব্দ। একজন ফোনে প্রেম করতে করতে অন্ধকারে তেলিগাতির ৫ ফিট চওড়া ড্রেনে পড়ে গেসে। বিড়িখোর গ্রুপের সবার এখন হাসা উচিৎ। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। যদি সে সিনিয়র হয়? ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করা হলঃ

— ভাই কে, কে ওখানে?

ড্রেনের ভেতর উঠে দাঁড়ায়ে একজন উত্তর দিল,

— আসসালামুয়ালাইকুম, আমি খালেদুর রহমান পিয়াস, ডিপার্টমেন্ট ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিয়ারিং , ব্যাচ টু কে টেন, হল অমর একুশে হল…

আমাদের কিছু কিছু বন্ধুত্ব এভাবেও শুরু হইসিল।

আমাদের সময় ফার্স্ট সেমিস্টারে কুয়েটের সবাই খুব হতাশ থাকত। এদের হতাশার মূল কারণ একটাইঃ কুয়েট। ফাস্ট সেমিস্টারে কুয়েটের সবার ধারণা থাকে তাঁর আসলে বুয়েটে পড়ার কথা, তাঁর কপাল খারাপ তাই সে কুয়েটে এসে ভর্তি হইসে। তাঁর সাথে একটা এক্সিডেন্ট হইসে। এমন অন্যায় তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব না। এবং সবার ধারণা যে শুধু সেই কপাল খারাপ বলে কুয়েটে পড়তেসে, বাকি যারা কুয়েটে আছে, এদের সবার কুয়েটেই পড়ার কথা। তাঁর শুধু কেমিস্ট্রির ঐ চ্যাপ্টারটায় দূর্বলতা ছিল, সব প্রশ্ন কেন ঐখান থেকেই হইল… ৬৬০ জন মানুষ, প্রত্যেকের ধারণা সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দূর্ভাগা। এই ধারণা সাধারণত ৬ মাস টিকে থাকে। ৬ মাস পর মোল্লা টের পায় সে মোল্লা, তাঁর দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, সে মওলানা না।

ফার্স্ট সেমিস্টারেই শুনলাম এক বন্ধু গাঁজা খাইসে। আমরা সবাই হতভম্ব। কি করল কি ও এটা! ছিহ! ছিহ! আমরা সবাই দল বেধে সেই বন্ধুকে বোঝাতে গেলাম। কিরে ভাই তুই গাঁজা খাবি কেন? তোর কোন সমস্যা থাকলে আমাদের বল, আমরা কি মরে গেসি? যাইহোক না কেন তোর সাথে, তাই বলে তুই গাঁজা খাবি? আমাদের এক বন্ধু সেই গাঁজাখোর বন্ধুকে শাসন করতে গিয়ে আবেগে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। সেদিন যারা গাঁজার প্রতি ঘৃণা থেকে বন্ধুকে বুঝাতে গেসিল, তারা কেউই পরে শুধু গাঁজাতে থামে নাই। আর যে বন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলসিল, সে অতিরিক্ত নেশার কারণে এখন মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন।

কুয়েটের একটু দূরেই ভৈরব নদী। নদীর ঘাটটা খুব সুন্দর। ফার্স্ট সেমিস্টারে আমরা কিছু হইলেই ভৈরবে যাইতাম। আমরা তখন ভার্সিটির ছাত্র, ব্যাপারটা কিন্তু সোজা না। ভার্সিটির ছাত্র তাও আবার ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির ছাত্র হওয়া সহজ ব্যাপার না। আপনাকে প্রচুর সিগারেট খাইতে হবে। আপনাকে পড়াশোনা করা যাবে না, কিন্তু ৩.৫০ আপ রেজাল্ট করা লাগবে। ফার্স্ট সেমিস্টারে আপনাকে নিয়ম করে ঢাকার জন্য মন খারাপ করা লাগবে, আপনার গার্লফ্রেন্ড যদি ঢাকার হয় সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ যে এই সময় আপনার ব্রেকাপ হবে তাই আপনাকে সেটা নিয়েও হতাশ হওয়া লাগবে। মেসে কারেন্ট থাকবে না, মশা কামড়াবে, লবণ পানিতে আপনার চুল পড়ে যাবে, খাওয়ার পানি নোনতা, অসহ্য গরমে আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন, আপনি নিয়ম করে বড় ভাইদের র‍্যাগ খাচ্ছেন, পলিটিক্যাল বড় ভাইরা আপনাকে হ্যারাস করতেসে… এগুলা হচ্ছে আপনার অপশন। এখন আপনাকে এইসব অপশন থেকে ৩,৪ বা ৫টা বেছে নিয়ে আপনার নিজঃস্ব হতাশা কম্পোজ করতে হবে। এরপর আপনাকে যেটা করতে হবে সেটা হল আপনাকে ভৈরবে যেতে হবে। যেহেতু ফাস্ট সেমিস্টারে আপনি গাঁজার সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন নাই, আপনাকে ভৈরবে গিয়ে খুব সিগারেট খাইতে হবে আর আফসোস করতে হবে। আপনি চাইলেও কোনদিন ভৈরবে একা যাইতে পারবেন না। আপনি যখনই যান, দেখবেন ফাস্ট সেমিস্টারের কেউ না কেউ সেখানে হতাশ চোখে চুপচাপ বসে আছে।

ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে অসাধারণ একটা শীত শুরু হইল। ৩ ফিট দূরের কিছুই দেখা যায় না। ২৪ ঘন্টা কুয়াশা। চাদর, জ্যাকেট, সুয়েটার কোন কিছুতেই শীত মানে না। আমরা তাও রোজ সন্ধ্যায় জুবুথুবু হয়ে হারিকেনের আলোয় পকেটগেটের চা দোকানে চা খাইতে বসি। আমার মাঝেমাঝে ঐ চা দোকানগুলার দোকানদার হইতে ইচ্ছা করে। চোখের সামনে কতজোড়া চোখ, এদের চোখে কত এনার্জি! এই এনার্জি মানুষের জীবন বদলে দেয়। এই এনার্জি নিউক্লিয়ার এনার্জির চেয়েও শক্তিশালী। এই এনার্জির জন্যই ৫ বছর পর এদের কেউ গুগলের ক্যালিফোর্নিয়া অফিসে এক মনে কোড করে যাবে, কেউ এই দোকানেই এই কাপেই রং চা খাবে আর কত ক্রেডিট বাকি সেটা গুনতে থাকবে। ৩ বছর পর এদের কেউ অস্ত্র মামলায় জেলে যাবে, কেউ নেশার কারণে পাগল হয়ে নিজের বাবার গালে থাপ্পড় মেরে ন্যাংটা অবস্থায় পুরো ক্যাম্পাস দৌড়াদৌড়ি করবে। এই পাশের জনের কাঁধে হাত দিয়ে বসা এই দুইজন ২ বছর পর আর বাকি জীবনে একে অন্যের সাথে কথা বলবে না। এই ট্যাটু করা ড্রামার ছেলেটা ৩ বছর পর তাবলীগে যোগ দিয়ে আর কোনদিন গান শুনবে না। ঐ লাল মাফলার পড়া ছেলেটা ৫ বছর পর নবম বারের মত সলিড মেকানিক্স পরীক্ষা দিয়ে এসে হলের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করবে।

যেখানে তোমার চোখ খুনী, আমি খুন হই..প্রতিদিন… প্রতিদিন।

লেখকঃ Rafid Al Zahur

আরো পড়ুন