1. powerofpeopleworld@gmail.com : jashim sarkar : jashim sarkar
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:১২ অপরাহ্ন

নেতৃত্ব দিতে ভালোবাসেন ? সফল নেতৃত্বের জন্যে যা আবশ্যিক !

“দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ” ছোটবেলা থেকেই খনার এই বচনটির সাথে আমরা সবাই খুব বেশি পরিচিত । টিমওয়ার্কের সুফল এটাই। একসাথে অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে, সেখানে সাফল্য পাওয়া যায় অনেক সহজে । কিন্তু টিম বা এই দলটিকে পরিচালনা করতে হলে, একজন নেতার প্রয়োজন, সেই সাথে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্বের । এমন প্রয়োজনবোধ থেকেই চলে আসে আরেকটি প্রশ্ন, “কি কি গুণাবলির সমন্বয়ে একজন সাধারণ মানুষ দক্ষ ও সফল নেতৃত্বের অধিকারী হয়ে উঠেন?”

দক্ষ নেতৃত্বই পারে একটি টিমকে সফলভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে । অন্যদিকে, বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায়ও এর গুরুত্ব অনেক বেশি । কেননা, বেশির ভাগ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই এক সময় বিজনেস ম্যাগনেট হয়ে উঠছেন নিজেকে দক্ষ নেতা হিসেবে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশেই এমন প্রচুর উদাহরণ রয়েছে । তবে যে কেউ রাতারাতি এই গুণগুলো আয়ত্ত করতে পারবে, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয় । দীর্ঘদিন নিয়মতান্ত্রিক পথচলা, নিজের ভেতর সাফল্যের স্পৃহা সহ নিজের মানসিক অবস্থার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব । চলুন দেখে নেওয়া যাক, সফলভাবে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে কি কি গুণাবলি আপনি নিজের ভেতরে বিকশিত করতে পারেন।

১) সততাঃ

“সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা” কথাটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত । ব্যবসা কিংবা একটি টিমকে পরিচালনা করতে গেলে প্রথমেই এই সততার ব্যাপারটি আসে । কারণ আপনি যে জায়গাটায় কাজ করছেন সেখানে আপনাকে প্রথমেই একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে । একটি সুন্দর পরিবেশই পারে কাজের দিকে আপনাকে পুরোপুরি মনোযোগী করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে । আর এই পরিবেশটি তৈরী করতে পারে আপনার সততা । বিজনেস পার্টনার বা সহকর্মী বা টিম-মেম্বাররা সবসময়ই একজন রোল মডেলকে দেখতে চান তাদের নেতৃত্বে । আপনি যদি সৎ থাকেন তাহলে এই কাজটি অর্ধেক হয়ে যায় । অন্যদিকে, নেতা হয়ে নিজেই যদি সৎ না থাকেন, তাহলে চারপাশের মানুষ আপনার অসততা দেখে নিজেরাও অনুপ্রাণিত হবে । আর এতে পুরো কাজেই একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে ।

২) নেটওয়ার্কিংঃ

একটা কথা প্রচলিত আছে, “প্রচারেই প্রসার” । হ্যাঁ, ঠিক তাই । আপনি যদি সফল নেতা হতে চান তাহলে নিজের প্রসারের জন্যে বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে । শুধু যোগাযোগ বাড়ালেই হবে না, তাদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে । কেননা, তাহলে আপনি তাদের সংস্পর্শে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন, যা পরবর্তীতে আপনাকে যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহায্য করবে । অন্যদিকে, এই প্রক্রিয়ায় আপনার থেকে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অন্য কারো সাথে পরিচয় হয়ে যেতে পারে । যা কেবল আপনার নেটওয়ার্কিংই বাড়াবে না বরং নিজের অভিজ্ঞতাকেও শাণিত করবে ।

৩) যোগাযোগের দক্ষতাঃ

আপনি টিম মেম্বার বা আপনার অধিন্যস্ত মানুষগুলোর সাথে কিভাবে আচরণ করছেন এটা অনেক বেশি প্রভাব ফেলে আপনার নেতৃত্বে । আপনার উচিৎ তাদের সাথে খুব সাবলীলভাবে যোগাযোগ করা । এই যোগাযোগের মধ্যে দিয়ে যাতে কখনোই মনে না হয় – আপনি প্রচুর ইগো শো করছেন তাদের সাথে । তাদের সাথে আর আট-দশটা মানুষের মতই আচরণ করুন । যেন আপনি সেনাপতি আর তারা আপনার যোদ্ধা । যোদ্ধা আর সেনাপতির মধ্যে বোঝাপড়া যদি ভালো না হয় তাহলে যুদ্ধে সাফল্য পাওয়া কিন্তু সহজ হবে না । এরজন্য তাদের সাথে কাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন । উদাহরণসরূপ হতে পারে, আপনার পুরো টিমের আল্টিমেট উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলতে পারেন কিংবা কর্মক্ষেত্রে তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলতে পারেন অথবা তাদের সাথে বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে মতবিনিময় করতে পারেন।

৪) ইতিবাচক ভাবনা করাঃ

যখন আপনি কোন একটা কাজে নেতৃস্থান দখল করছেন, তখন আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক হতে হবে । এর প্রথম কারণ, ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা আপনাকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে প্রচুর সহায়তা করবে । দ্বিতীয় কারণ, ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা আপনার কর্মক্ষেত্রের অন্য মানুষগুলোকে অনুপ্রেরণার যোগান দেবে, তারা পুরোদমে কাজ করতে পারবে । আরেকটি কারণ হলো, ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার কারণে আপনি আপনার সর্বোচ্চটা দিতে পারবেন । কিন্তু আপনি যদি নেতিবাচক চিন্তা করতে আরম্ভ করেন তাহলে আপনি হীনমন্যতায় পড়ে যেতে পারেন আর এটিই হতে পারে আপনার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম বাঁধা ।

৫) কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিনঃ

কাজের ভেতরে এমনভাবে ডুবে যান, কাজকে এমনভাবে ভালোবাসুন , কাজ নিয়ে এত বেশি ভাবুন যেন কাজ এবং আপনি অবিচ্ছেদ্য দুটি শব্দ হয়। আপনি যখন কাজ নিয়ে ভাববেন তখন পুরো পৃথিবী হয়ে যাবে আপনার কাজ । আপনি তখন বাহ্যিক অনেক বিষয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে যেতে পারবেন । কাজের প্রতি একাগ্রতা আপনার অধীনস্থ মানুষগুলোকেও মোটিভেট করবে । তারাও ঠিক একইভাবে কাজে মনোযোগী হয়ে উঠবে । অন্যদিকে, যখন কাজই আপনার ধ্যান-জ্ঞান হবে, তখন আপনি প্রতিদিন নিজের সাফল্যকে আবিষ্কার করতে পারবেন । যা আপনার আগামী দিনের জন্যে পাথেয় হয়ে থাকবে ।

৬) সৃজনশীল হোনঃ

সৃজনশীলতা একটি সাধারণ বিষয়কেও অসাধারণ করে দিতে পারে । সৃজনশীলতা আপনাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করবে; আপনি হয়ে উঠবেন অনন্য । নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ । কারণ, সৃজনশীল মনোভাবের কারণে আপনি নতুন নতুন আইডিয়া পাবেন আর ঠিক তখনই আপনি নিজের স্বকীয়তার জানান দিতে পারবেন পুরো পৃথিবীকে । আমাদের সবার জন্মগতভাবে একটা বৈশিষ্ট্য আছে। তা হলো– আমরা ভিন্ন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হই । ধরুন, আপনি ব্যবসার ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারে একটি মোবাইল কোম্পানীর বাজার সৃষ্টি করতে চাইছেন । কিন্তু আপনি যদি অন্য সবার মতই গতানুগতিক ফিচারের একটি মোবাইল বাজারজাত করলেন, তাহলে মানুষ কেন আপনার প্রোডাক্টের দিকে আকৃষ্ট হবে? আপনাকে বাজার ধরে রাখতে চাইলে অবশ্যই সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনার মধ্যে দিয়ে নতুনত্ব আনতে হবে । তাহলেই আপনি সাফল্যকে ছুঁতে পারবেন।

৭) প্রতিদিন নতুন কিছু শিখুনঃ

স্কুল-কলেজের গণ্ডিতে পাঠ শেখা খুব বিরক্তকর লাগতে পারে আপনার কাছে । কিন্তু পৃথিবীর পাঠশালায় নিজেকে ভর্তি করুন, এতে জীবনকে অন্যভাবে আবিষ্কার করতে পারবেন । নতুন আবিষ্কার একই সাথে আপনার অভিজ্ঞতা আর সৃজনশীলতা দুইয়েরই বিকাশ ঘটাবে । আপনার কাছে এমন অনেক বিষয় তুলে আনবে যা আপনি এতদিন ভাবতেও পারেননি । এই নতুন জানা বিষয়গুলো কাজের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা জোগাবে । অন্যদিকে, জানার এই আনন্দ আপনাকে আপনার অনেক কষ্টের অভিজ্ঞতা থেকেও মুক্তি দেবে । নিজের উপর বিশ্বাস জোগাবে, আত্নবিশ্বাস বাড়াবে।আত্নবিশ্বাসের জোরে সাফল্য আপনার কাছে আসতে বাধ্য ।

৮) অধ্যবসায়ঃ

অধ্যবসায় করুন । অধ্যবসায়ের ফলে মানুষ পাহাড়ও জয় করতে পারে । আপনি তো নেতৃত্বকে জয় করার নেশায় মেতেছেন । অধ্যবসায় দিয়ে সকল বাধাকে উপড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে যান । অধ্যাবসায়ী মনোভাব আপনার ভেতর থেকে ভয় কিংবা রণে ভঙ্গ দেয়ার বিষয়টি তাড়িয়ে দিবে।সফল নেতৃত্ব দিতে অধ্যবসায় নিজের যত সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলোকে জয় করে নেবে ।

৯) অন্যের ভুলকে মূল্যায়ন করুনঃ

মানুষ মাত্রই ভুল করে । নেতৃত্বে এলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আপনার সাথে যারা কাজ করছে তাদের ভুলত্রুটি চোখে পড়বে । টিম-মেম্বার বা সহ-যোদ্ধাদের ভুল দেখলে তা নিয়ে হাসি ঠাট্টা কিংবা মেজার গরম দেখাবেন না । বরং তাদের সাথে ভুলগুলো নিয়ে মুক্তভাবে আলোচনা করুন । ভুল সমাধানের পথ খুঁজে বের করুন । এটা আপনার উপর সহ-যোদ্ধাদের আস্থা বাড়াবে । যার ফলে তারা পরেরবার ভুল করার ব্যাপারে সর্তক হয়ে যাবে।

১০) অন্যের সমালোচনা গুরুত্বের সাথে দেখুনঃ

নিন্দুকের কথা শুনে সেটাকে ইগনোর করে যাওয়া উচিৎ নয় । অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা গুরুত্বের সাথে নিন । তাদের সমালচনা থেকে নিজের ভুলগুলোকে শুধরে নিন । অন্য কারো সমালোচনা দেখে হতাশ হয়ে যাবেন না । সমালোচনার একটা ভালো দিক হলো – আপনি আপনার কাজের একটা ভালো-মন্দ মূল্যায়ন জানতে পারছেন । নেতিবাচক সমালোচনাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখুন । একটা নেতিবাচক বিষয় আপনার কাজে থাকতেই পারে । কিন্তু তারমানে এই নয় যে, আপনি সেই ভুলগুলোকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবেন না । তাই সমালোচনা গ্রহণ করুন, নিজেকে পুনঃরুজ্জীবিত করুন ।

১১) ব্যর্থতা থেকে শিখুনঃ

আপনি যদি পৃথিবীর বড় বড় মানুষের জীবনী পড়ে থাকেন তাহলে দেখবেন, তারা আগে ব্যর্থ হয়েছেন তারপর সফলতাকে ছুঁয়েছেন । একটা গাছের মগডালে উঠতে হলে কিন্তু প্রথমে গাছের নিচ থেকেই ধীরে ধীরে উপরে উঠতে হয় । আবার উঠতে গিয়ে আপনি বারবার পড়েও যেতে পারেন । কিন্তু লক্ষ্য করবেন, যতবার আপনি পড়ে যাচ্ছেন, ততটাই মগডালে ওঠার কৌশল আপনি আগের চেয়ে ভালভাবে রপ্ত করতে পারছেন । নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তেমনই । আপনি ব্যর্থ হবেন সফলতা পাবার জন্যে, ব্যর্থতা থেকে শেখার জন্যে । যখন এই শিক্ষায় পরিপক্ক হতে পারবেন, তখন আপনার ব্যর্থতা পূর্ণতা পাবে । তাই ব্যর্থতা থেকে হতাশ হয়ে পড়বেন না। ব্যর্থতার কারণ ব্যবচ্ছেদ করুন, পরেরবার কাজের ক্ষেত্রে সেই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলুন ।

১২) প্রতিনিধিত্ব করুনঃ

নিজের কাজকে প্রতিনিধিত্ব করুন । নিজের টিমের প্রতিনিধি হয়ে উঠুন । প্রতিনিধিত্ব নেতৃত্বের একটা বিশেষ অংশ । নিজের টিমের ভুলগুলোর পুরো দায়ভার প্রতিটা মেম্বারের উপর না দিয়ে নিজেও কিছুটা নিন । এতে করে আপনার টিম মেম্বাররা নিজেদের কাছে অপরাধবোধে কম ভুগবে । আপনি তাদের বলুন, ভুলটি কেবল তাদের একার না আপনারও । কেননা আপনি সবাইকে ঠিকভাবে চালিত করতে পারেননি । এতে করে একদিকে সুসম্পর্কে বজায় থাকবে এবং আপনার ভেতর একটা সতর্কতা কাজ করবে ।

১৩)নিজের ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিনঃ

নিজেকে ব্যক্তিবান হিসেবে গড়ে তুলুন । ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের পরিমণ্ডলে খুব সহজেই জনপ্রিয়তা পায়, সবাইকে আপন করে নিতে পারে । নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এটি থাকা একান্ত জরুরী । আপনি যদি ব্যক্তিত্ববান না হন, তাহলে নেতৃত্বের বাকী গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটানো আপনার জন্যে কঠিন হয়ে পড়বে । তাই ব্যক্তিত্বের বিকাশকেও গুরুত্ব দিন ।

কথায় আছে, নেতৃত্বকে অর্জন করতে হয় । অর্জন করতে হলে যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, সেগুলো ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে নিয়ে আসতে চেষ্টা করুন । নেতৃত্বের মাধ্যমে সফলতা আপনারও আসবে । নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের এই যাত্রায় আপনার জন্যে শুভকামনা থাকলো পাই ফিঙ্গার্সে মোটিভেশনের পক্ষ থেকে ।

আরো পড়ুন