1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন

বার্ষিক পরীক্ষা নামক ফাইনাল যুদ্ধে আমি কৃতিত্বের সাথে ১০০ তে ৫৬ পাইলাম, মাইরের উপর ওষুধ নাই !

“ছাত্র হিসেবে আমি কখনোই মনোযোগী ছিলাম না .. ক্লাস সিক্সের প্রথম টার্মে ম্যাথে ১০০ তে ৫৭ পাইলাম … আমার এখনো মনে আছে, আমার ছোট চাচা আমাকে দুইটা কাঠের স্কেল একত্র করে পিটায়ে কিছু রাখে নাই সেবার ..আমার শিক্ষা হয় নাই !!

পরের টার্মে আমি ১০০ তে ৫৮ পাইলাম ..সেইবারও ধুন্ধুমার রকমের ধোলাই খাইলাম .. কাঁদতে কাঁদতে শপথ নিলাম, বার্ষিক পরীক্ষাতেই দেখায়ে দিবো আমি কি জিনিস!!

নাটক সিনেমাতে নায়ক একদম ফাইনাল যুদ্ধতে গিয়ে জিতে বাড়ি ফিরে … আমার জীবনটা নাটক সিনেমাও না এবং আমি কোন নায়কও না … তাই বার্ষিক পরীক্ষা নামক ফাইনাল যুদ্ধে আমি কৃতিত্বের সাথে ১০০ তে ৫৬ পাইলাম … মাইরের উপর ওষুধ নাই … ওষুধে যদিও কাজ হচ্ছিলো না … তাও আমাকে ওষুধের ডোজ দেয়া হইতে থাকলো!!

এসএসসি তে কপালে জিপিএ ৫ জুটলো … বাবা-মা ভাবলো, যাক, ছেলেটার একটা গতি হইলো … কলেজ ভর্তি যুদ্ধেই আমি আবার পা ফসকে পড়ে গেলাম … স্কুল লাইফের প্রায় সবগুলা বন্ধু যখন নটরডেমে চান্স পাইলো, আমার সেখানে জায়গা হইলো না!!

আমি আমার মায়ের চোখে পানি দেখছিলাম সেইদিন সকালে … এই পৃথিবীতে সবকিছু সহ্য করা যায়, সব … শুধু মায়ের চোখের পানি সহ্য করা যায় না!!

সেই রাতে প্রথমবারের মত আমার সুইসাইড করতে ইচ্ছা হচ্ছিলো … কিভাবে কিভাবে জানি আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমায় গেছিলাম সে রাতে !!

ভার্সিটির ভর্তি যুদ্ধে আবার আমার পা ফসকালো … বাবা-মা এর হাই এক্সপেকটেশন অনুযায়ী বুয়েটে আমার জায়গা হয় নাই … ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সিরিয়াল ছিল অনেক পেছনের দিকে!!

আমি আবার আমার মা কে কাঁদতে দেখলাম … আমার এবার সত্যি সত্যি মরে যেতে ইচ্ছে হলো … খোজ খবর নিয়ে ঘুমের ওষুধ যোগাড় করছিলাম …

পড়াশুনার মত এই বেলায়ও আমি ব্যর্থ হলাম !!
আমার জীবনে ব্যর্থতার শেষ নাই … আমার জীবনে বহুবার এমন অবস্থা আসছে, যখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে !!

আব্বার কলিগের ছেলে বুয়েটে চান্স পাইলো, আমি কেন পাইলাম না ?? – এই ধরণের অসহ্য তুলনা দিয়ে বাসায় আব্বার চিৎকার শুনে আমার দম আটকে আসতো এক সময় … আত্মীয় স্বজনের খোঁচা কিংবা অন্য মানুষের উপহাস শুনে যখন দেখতাম, আমার মত ব্যর্থ সন্তানের জন্য আব্বার মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে, আমার তখন বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছা একদম মাটিতে মিশে যাইতো !!

আমি বেশ কয়েকবার মরে যাওয়ার ইচ্ছাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বেঁচে গেলাম … আল্লাহর রহমতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হইলো … কিন্তু এখানেও ব্যর্থতা আমাকে ছাড়ে নাই … বাসা থেকে দূরে থাকার ডিপ্রেসনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে প্রথম টার্ম ফাইনালের ম্যাথ পরীক্ষায় আমি সব ম্যাথ কেটেকুটে দিয়ে ১ ঘন্টা পর হল থেকে বের হয়ে আসলাম … জীবনে প্রথমবারের মত ফেল করে বসলাম … নিজের রোলের পাশে F লেখা দেখে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল আমার সেইদিন !!

পড়াশুনাজনিত ডিপ্রেসনে আমি প্রায়ই ভুগতাম … আমার প্রায়ই মরে যেতে ইচ্ছে হইতো … হয়তো সামনে আরো ভুগবো … কিন্তু আমি এখনো বেঁচে আছি … কারণ আমি জানি, মরে যাওয়াটা কোন সমাধান না !!

আমি ঐ দিনগুলোর যে কোন একদিন মরে যাইতে পারতাম … প্রচন্ড হতাশ হয়ে পড়াশুনা ছেড়ে দিতে পারতাম … রাস্তায় ঘুরে বেড়াইতে পারতাম …গাঁজার নেশা করে রাস্তায় পড়ে থাকতে পারতাম … হতাশ হয়ে যেতে পারতাম … কিন্তু আমি অন্য রাস্তায় হাঁটছি … সেদিন মরে গেলে, আমি আজকে এইভাবে থাকতে পারতাম না !!

আমার সিজিপিএ ভালো না … এখনো আমি মহা ব্যর্থ … তবুও আমি বেঁচে আছি … কেন বেঁচে আছি ?? … কারণ আমি জানি, এটাই শেষ না … কোন না কোনভাবে আমাকে জীবনে সফল হইতেই হবে … কষ্ট করে হলেও, দেরিতে হলেও … আমি পারবো … একদিন পারবোই !!

ব্যর্থ হইতে হইতে, কষ্ট পাইতে পাইতে যে কোনভাবেই হোক, আমি আমার ভার্সিটি জীবনের শেষ বছরে দাঁড়িয়ে আছি … সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বছর খানেক পরেই আমি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে জীবনের প্রথম বেতন পেয়ে আমার বাবা-মা এর হাতে তুলে দিবো … বাবা-মা এর মুখের হাসিটুকুই আমার জীবনের সফলতা হবে !!

আমি এমন একটা ছেলেকে চিনি, যে প্ল্যান করেছে, এইচএসসির রেজাল্টের দিন রেজাল্ট খারাপ হলেই সে সুইসাইড করবে … আমি এমন একটা মেয়েকে চিনি যে মেডিকেলে চান্স না পেলে ছাদ থেকে লাফ দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছে !!

ডিপ্রেসন যখন কাউকে জেঁকে ধরে, তখন তাকে হাজার বুঝালেও কাজ হয় না … সান্ত্বনার বাণী দিয়ে লাভ হয় না !!

কিছুদিন পরেই এইচএসসির রেজাল্ট … তারপর অ্যাডমিশন টেস্ট … কেউ কেউ জিপিএ ৫ পাবে না … কেউ ফেল করবে … কেউ অ্যাডমিশন টেস্টে ব্যর্থ হবে … আমার চেয়েও অনেক অনেক খারাপ অবস্থা হবে কারো কারো !!

যারা ব্যর্থ হবে, তাদের মানসিক অবস্থাটা কতটা খারাপ হতে পারে, আমি এইটা কিছুটা হলেও টের পেয়েছি ২ বছর আগে … রেজাল্ট দেওয়ার পর মূহুর্তে মরে যেতে ইচ্ছা করছে – এরকম মানুষের সংখ্যা অনেক !!

মরলে কি হবে ?? … তুমি দ্বিতীয়বারের মত তোমার বাবা-মা আর কাছের মানুষগুলাকে কাঁদাবা … আর কিছুই না !!

তার চেয়ে বরং একটা কাগজ বের করো … কাগজে লিখো, তুমি এর পরেরবার পারবা … কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দাও !!

তুমি রেজাল্টের দিন নাহয় একটু কাঁদো … কাঁদাটা দরকার … তারপর চোখের পানি মুছে বইখাতা নিয়ে বসে পড়ো … “নেক্সট টাইম” বলে সবসময়ই কিছু আছে … ইন ফ্যাক্ট, অ্যাডমিশন টেস্ট শেষ হয়ে গেলেও “নেক্সট টাইম” আছে … ভার্সিটির বাকি জীবন আছে, চাকরির জীবন আছে … জীবনটা এখনো অনেকটাই বাকি !!

হ্যাঁ, তুমি হয়তো ভালো ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পাবে না, তাতেই কি জীবন শেষ ?? … ভালো ভার্সিটিগুলোতে সিট কয়টা থাকে ?? … আর সারা দেশে সর্বমোট পরীক্ষার্থী কতজন ?? … বাকি সবাই কি মরে যায় ?? … বাকি লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েগুলো কি জীবনে কখনো SHINE করতে পারে না ?? … পারে … অবশ্যই পারে !!

একটা ভালো রেজাল্ট কিংবা একটা ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার অর্থ হলো, তোমার জীবনে SHINE করার পথটা একটু সহজ হলো, একটা প্ল্যাটফর্ম পেলে তুমি … স্বীকৃত ভালো ভার্সিটিতে না পড়ে কিংবা জিপিএ ৫ না পেয়েও জীবনে শাইন করা যায়, ট্রাস্ট মি … শুধু তোমার পথটা একটু কঠিন হবে … শুধু তোমাকে একটু বেশি কষ্ট করতে হবে … তোমার মেধা থাকলে, চেষ্টা থাকলে তোমাকে কেউ দমায়ে রাখতে পারবে না … তুমি যেখানেই পড়ো আর যেমন রেজাল্টই করো না কেন … এটাই সত্যি !!

একবার ব্যর্থ হওয়ার পর “এটাই শেষ” – ভেবে নিলেই আসলে সব শেষ … কোন কিছুই শেষ হয় না …
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলটাকেই দেখো … একসময় ৩ দিন এর মধ্যে টেস্ট ম্যাচ হারতো ওরা … কতই না হাসাহাসি করতো বিশ্ববাসী ক্রিকেট দলটাকে নিয়ে … ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জা, হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার গ্লানি নিয়ে বছরের পর বছর ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে বসে ছিল এই দলটা … এখন দেখো, ওরাই অন্যদের বাংলাওয়াশ করে … সেদিন ব্যর্থতা সহ্য করতে না পেরে মাশরাফিরা যদি খেলা ছেড়ে দিতো, হাল ছেড়ে দিতো, ডিপ্রেসনে আত্মহত্যা করতো, আজকে কেমন হতো তাহলে ??

তোমার চোখের সামনেই উদাহরণ … দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে জিতে যাওয়ার উদাহরণ … হাজার ব্যর্থতার পরও সফল হওয়ার উদাহরণ … তুমি দেখো এবং শেখো … বোকার মত মরে যেও না !!

জীবনে SHINE করার জন্য অনেক সুযোগ আসবে, অনেক … তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না …তোমাকে শুধু বেঁচে থাকতে হবে … চোখের পানি মুছে বেঁচে থাকতে হবে … আজকে হারছো … হয়তো কালকেও হারবা … তারপর পরশু ঠিকই জিতবা .. তুমি শুধু একটু বেঁচে থাকো.. শুধু একটু চেষ্টা করতে থাকো !!”

মুশফিকুর রহমান আশিক ( কুয়েট )

আরো পড়ুন