1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

যেখানে পড়ালেখা করতে টাকা খরচ হয় না!

উন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনার খরচ এমনিতেই অনেক বেশী। সুতরাং, তারা তাদের নিজেদের ছেলে পেলেদের জন্য কি রকম সুযোগ সুবিধা রেখেছে, সেটা আমাদের জানা দরকার বলে মনে করি। তাতে আমাদের অর্থমন্ত্রীর প্রহসনটা ম্যাগনিফাইনিং গ্লাসের নীচে ধরা পড়বে। অন্য দেশের কথা জানি না, তবে অষ্ট্রেলিয়া তার নাগরিকদের সেমিষ্টার ফি দেবার জন্য অবিশ্বাস্যরকমের এফর্টবেল দুটো প্রোগ্রাম চালু রেখেছে।

কোমল মতি ছাত্র-ছাত্রীদের যেন পড়াশোনার পেছনে কোন টাকা পয়সা খরচ করতে না হয়, সে কারনে ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার লেবার সরকার তার দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ও অভিনব এক ঋন সুবিধা চালু করলো। এটা এতটাই সুবিধাজনক ও শিক্ষার্থী- বান্ধব যে, আপনার মনে হবে আপনি পুরোপুরি ফ্রিতেই পড়াশোনা করছেন। একে বলা হয় Higher Education Contributions Scheme (HECS)।

আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে যে কোন অষ্ট্রেলিয়ান নাগরিক, অথবা নিদেনপক্ষে স্থায়ী অভিবাসনের অনুমতি পেয়েছেন এমন যে কোন ব্যক্তি এই হেক্স প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এবার দেখা যাক হেক্স জিনিসটা কি।

আপনি গ্রাজুয়েশন করতে চান, কিন্তু হাতে টাকা পয়সা নাই? অথবা থাকলেও আপনি চান না পড়াশোনার পেছনে একটা সেন্টসও খরচ করতে? কোন সমস্যা নাই। অষ্ট্রেলিয়ার জাতীয় সরকার (যার নাম কমনওয়েলথ গভঃ) আপনাকে এত চমৎকার একটা ঋন সুবিধা দিবে যে, আপনার মনে হবেই হবে না যে আপনি নিজের গাটেঁর পয়সা খরচ করে পড়াশোনা করছেন। ইয়েস! আমি এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলছি না। বিস্তারিত প্রমান কমেন্টের ঘরে।

ধরেন, আপনার সেমিষ্টার ফি (প্রতি ৪ মাস অন্তর) ১০ হাজার ডলার। হেক্স প্রোগ্রামের আওতায় আপনাকে প্রায় অর্ধেক মানে ৫ হাজার ডলার বিনা সুদে ঋন দেয়া হবে, যে ঋন আপনি পড়াশোনা শেষ করে চাকরী নিয়ে যখন ”অনেক টাকা”* (পোষ্টের নীচে এই “অনেক টাকা” কথাটার সংজ্ঞা দেয়া আছে।) কামাবেন, সেই সময় ট্যাক্স অফিস আপনার সাপ্তাহিক বেতন থেকে অল্প অল্প করে অটোমেটিকলি কর্তন করা নিবে।

আচ্ছা বেশ। বাকী ৫ হাজারের চিন্তা করছেন তো? ধরেন আপনার সেই ৫ হাজার ডলার দেবারও সার্মথ্য নাই; অথবা আছে, কিন্তু ঐ যে বল্লাম, আপনি বাকীতে পড়তে চান, নিজের টাকা খরচ করে পড়বেন না বলে পণ করেছেন। তাতেও কোন সমস্যা নাই। কমনওয়েলথ সরকারের পর এবার আপনাকে ‍ঋন দেবার জন্য ডলারের বান্ডিল নিয়ে বসে আছে ষ্টেট সরকার। হেক্সের মতো কাজ একই হলেও অবশ্য তাদের প্রোগ্রামের নামটা ভিন্ন। Higher Education Loan Program (HELP)। এবং আক্ষরিক অর্থেই শিক্ষাথীদের হেল্প করার জন্য তারা মুখিয়ে থাকে।

এই প্রোগ্রামের আওতায় আপনার সেমিষ্টারের বাকী ৫ হাজার ডলারও তারা নিজ দায়িত্বে শোধ করে দিবে।

তাহলে আপনাকে সেমিষ্টার ফি বাবদ দিতে হলো মোট কত টাকা? একটা পয়সাও না। 🙂

এমনকি হেক্স বা হেল্প এর ঋনগুলোর জন্য আপনাকে একটা পয়সাও সুদ দিতে হবে না।

সুযোগ সুবিধা এখানেই শেষ না।

ক. পড়াশোন শেষ করে যদি আপনি গ্রাম বা মফস্বলের কোন অজ পাড়া গায়ে চাকরী করেন? আপনার হেক্সের ঋন অর্ধেক মাফ।

খ. আপনি আদীবাসীদের সমাজ কল্যানে চাকরী করেন? আপনার হেক্সের ঋন অর্ধেক কমে যাবে।

গ. অথবা আপনি জনবসতিহীন প্রায় মরূভুমিতে চাকরী করেন (যেমনঃ পার্থ বা এডিলেইড সিটির বাইরে) যেখানে তেমন কোন সভ্য নাগরিক সুবিধা নাই? আপনার হেক্সের ঋন অর্ধেক মাফ। 🙂

প্রতি বছর ’হেল্পের’ লোনের উপর ইনডেক্সিং করা হয় অবশ্য, যদি আপনার ঋন টানা ১১ মাস অপরিশোধিত থাকে আর কি।

যেমনঃ আপনার ইনকাম খুব কম কিন্তু জীবন যাত্রার মান ভালো (বাপের টাকা পয়সা আছে আর কি) সেক্ষেত্রে আপনার হেক্স লোনের উপর বছরে কিছু বাড়তি টাকা যোগ হবে। এ বছর এটা ২.১%। গত বছর ছিলো ২.৪%।

কেউ যদি চায় চাকরী পাবার প্রথম বছরেই সমুদয় হেক্স-লোন শোধ করে দিতে চায়, তবে তার জন্যও আছে আকর্ষনীয় ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা!

কেন হেক্স আর হেল্প এর মতো এত বেশী সুবিধাজনক ঋন সিষ্টেম অষ্ট্রেলিয়া সরকার প্রণয়ন করলো?

সোজা কথায় উত্তরটা হচ্ছে, অষ্ট্রেলিয় নাগরিকদের উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে উৎসাহিত করা।

তাহাদের কি উৎসাহের অভাব?

জ্বি হ্যাঁ; শুধু অভাব না, ভয়ানক অভাব।

আমাদের দেশের একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েকেও দেখা যায় খেয়ে না খেয়ে এমএ পাশ করতে। এইখানে ব্যাপারটা এমন না। অজিরা সপ্তাহে ২ হাজার ডলার কামাই করলেও পড়াশোনার পেছনে ফুটা পয়সা খরচ করতেও তাদের বেশীরভাগেরই কলিজা ছিড়েঁ যায়। আমাদের মতো ওভারসীজ ছাত্রদের মতো বছরে ৩০/৪০ হাজার ডলার দিয়ে পড়াশোনার কথা তারা দিবাস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না। যদি করতে হতো, তবে আমি নিশ্চিত তারা দুইদিনের ভেতর সরকারের পতন ঘটাতো।

অষ্ট্রেলিয়ার বাস্তবতাটা হলো, অষ্ট্রেলিয়ার তরুন প্রজন্মের সিংগ ভাগই গ্রাজুয়েশন লেভেলে যাবার আগেই ঝড়ে পরে। পলিটেকনিক্যাল ইনসটিটিউট থেকে (এইখানে এর নাম TAFE) কোনমতে সুইপার বা চাবিওয়ালা হওয়ার ট্রেনিং নিয়ে তারা একটা মাইক্রোবাস নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। ঘন্টায় ৫০-১০০ ডলার কামায়। ইউকএন্ডে বন্ধু বান্ধবী নিয়ে বারে গিয়ে ফূর্তি করে। গাড়ী বাড়ী বিয়ে শাদি সব হয় ক্রেডিট কার্ড নয়তো ব্যাংক লোন দিয়ে। আর বাপ বা মায়ের নামে যদি একটা হাউজ (বাড়ী) বা ইউনিট (ফ্ল্যাট) থাকে তাইলে তো কথাই নাই। সুতরাং, ওদের কি ঠ্যাকা পড়সে আমাদের মতো নিজের গাটেঁর কাড়ি কাড়ি ডলার খরচা করে বছরের পর বছর ধরে ইউনিতে গিয়ে রাত জেগে হামানদিস্তার মতো বই পড়ে গ্রাজুয়েট হবার, বলেন?

নিজের উর্পাজন বা জমানো টাকা দিয়ে পড়াশোনা করাটাকে এইখানে পুরাই লস প্রজেক্ট হিসাবে ধরা হয়। আর এই কারনেই সরকার বলতে গেলে হাতে পায়ে ধরে ছেলেপেলেদের পড়াশোনাদের জন্য ঋন দেয়। তাও তো পড়ে না। কিন্তু সরকারের তো চলতে হবে? এই কারনেই প্রতি বছর অষ্ট্রেলিয়া ৩য় বিশ্বের দেশগুলো থেকে পিআর আর উন্নত জীবনের মুলো দেখিয়ে তরুন ছাত্র-ছাত্রীদের এইখানে নিয়ে আসা হয়। সেমিষ্টার ফি দিবা, কামলা দিবা, ট্যাক্স দিবা, GST দিবা। সব কিছু দিবা। আর বিনিময়ে পাইবা পিআর আর উন্নত লাইফস্টাইলের ঝুলানো মুলা!

এই কারনেই এখানকার সরকার প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিজ্ঞাপন ও ক্যাম্পেইন করে, যাতে করে তাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা উচ্চতর শিক্ষা নেয়, বা কমপক্ষে গ্রাজুয়েট হয়। যারা স্কুল বা কলেজ থেকে ঝড়ে পড়ে, তাদের চাইতে গ্রাজুয়েটওয়ালারা বছরে ৭৫% বেশী বেতন পায়, এইরকম একটা হিসাব খুঁজেঁ বের করে শিক্ষা মন্ত্রনালয় ইদানিং চারিদিকে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে।

নিজেদের ছেলেমেয়েদের হায়ার এজুকেশন দেবার ব্যাপারে চেস্টার কোন কমতি নাই সরকারের। তাও এখন পর্যন্ত তেমন কোন দৃশ্যমান ফলাফল দেখা যায়নি। অষ্ট্রেলিয়ার যে কোন ইউনিতে দেশীয় অজিদের চাইতে এখনও বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীরাই বেশী।

অষ্ট্রেলিয়ার এজুকেশন সিস্টেম পৃৃথিবী বিখ্যাত। তাদের জাতীয় আয়ের প্রথম উৎস খনিজ শিল্প। ২য় হইতেছে ইউনির সেমিষ্টার ফি। আমাদের মতো বিদেশী ছাত্র ছাত্রীদের পকেট কেটে নিয়ে তারা নিজেদের ছাত্র ছাত্রীদের সহজ শর্তে ঋন দেয় যাতে করে তারা পড়াশোনা করে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারে। এই কারণেই এই প্রোগ্রামের ওয়েব সাইটে বড় করে লেখা আছে – Your future is Australia’s future.

আফসুস, মাল মুহিত এই জিনিসটাই বুঝলো না। যেটা করার জন্য সরকারী সাহায্য দেয়া উচিত দেশের প্রতিটা ছাত্রছাত্রীকে, সেটা যখন তারা নিজেদের কামাই বা নিজেদের বাপ মায়ের হাতের কামাই দিয়ে করতে চেষ্টা করতেছেম সেইটার উপর একজন মন্ত্রী কতটা নির্বাধ আর শোষক হলে বেহুদা ট্যাক্স বসাতে পারেন, আমার মাথায় আসে না!! ১০ কোটি শিক্ষার্থীর দেশে হেক্স বা হেল্প প্রোগ্রাম চালু করলে সরকারই ফকির হয়ে যাবে, মানছি। কিন্তু তাই বলে বাড়তি ভ্যাট আর পুলিশি গুলির বোঝা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়াটা কতটুকু গ্রহনযোগ্য!!?

আমি শুনেছি, শুধু নিজের দেশের ভেতর নয়, হেক্সের আওতায় যে কোন অজি নাগরিক দুনিয়ার যে কোন দেশে পড়াশোনা করতে পারবে। এ্যামেরিকাতে পিএইড করতে চান, বা জার্মানিতে পোষ্ট ডক্টরাল? নো ওরিস মাইট! খরচ দিবে অজি সরকার। তুমি বাপু নিজের পায়ে দাড়িঁয়ে চাকরী বাকরী করে আস্তে ধীরে সময় নিয়ে ঋন শোধ করিও। কোন তাড়াহুড়ো নাই। এই না হলে সরকার। আর আমাদের সরকার? ভ্যাট বসায়, সেটা নিয়ে কথা বলতে গেলে গুলিও চালায়। 🙂

শুধু অষ্ট্রেলিয়া নয়, আজ আমার জিমের ইনসট্রাকটরের কাছে শুনলাম মিডল ইস্টের দেশ গুলাতেও এই অবস্থা। ওখানে আরো বেশী সুবিধা। বিদেশে উচ্চতর পড়াশোনা বা গবেষনার জন্য খরচ সরকার দেবে, এবং সেটা কখনই আপনাকে শোধ করতে হবে না। শুধু শর্ত থাকবে, পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। আমাদের এই সময়ে এইসব স্রেফ রূপকথার মতই মনে হয়।

পাদটীকাঃ *অনেক টাকা = এই অনেক টাকার পরিমান ২০১৫ সালের জন্য নির্ধারন করা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ডলার বাৎসরিক বেতন। টাকার মূল্যে যা প্রায় ৩২ লাখ টাকা। মানে হলো, আপনি যদি গ্রাজুয়েট হবার পর চাকরী বাকরী করে বছরে ৩২ লাখ টাকা না কামাতে পারেন, তবে আপনাকে হেক্সের ঋন বাবদ একটা পয়সাও শোধ করতে হবে না। কিন্তু যখনই আপনার ইনকাম ৩২ লাখে পৌছঁবে, শুধুমাত্র তখনই আপনার জন্য ঋন শোধ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।

অষ্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও বছরে এই পরিমান টাকা কামাই করা মানে বিরাট ব্যাপার। আমি মাত্র দেড় বছর পেরেছিলাম। এই কারণে আমি অনেককেই দেখেছি হেক্স থেকে লোন নিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চাকরী করতে। চাকরী নেবার প্রথম ৫ বছর তাদেরকে একটা পয়সাও শোধ করতে হয় নাই।

আপনার ইনকাম যত বেশী হবে, আপনার ঋন শোধের পারসেনটেজও সেই হারে বাড়বে। যতদূর মনে পড়ে, বছরে এক লাখ ডলার ইনকাম হলে আপনাকে মোট ঋনের মাত্র ৭.৫% শোধ করতে হবে। (আর ঠিক এই রেটেই আমাদের দেশের শিক্ষাখাতে ’ভ্যাট’ বসানো হয়। কি সেলুকাস!!) যে লোক এই বিপুল পরিমান টাকা কামায়, তার নিশ্চয়ই ৭.৫% ঋনের বোঝা গায়েও লাগে না।

অষ্ট্রেলিয়ার হেক্স আর হেল্প প্রোগ্রাম নিয়ে যারা বিস্তারিত জানতে চান, তাদের জন্য অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও ব্যবহারকারী-বান্ধব (ইউজার-ফ্রেন্ডলি) এক ওয়েব সাইট বানিয়ে অজি সরকার বসে আছে।

(রিপোষ্ট। প্রথম প্রকাশঃ ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং। সে বছরের ভ্যাট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা)

– প্রলয় হাসান

আরো পড়ুন