1. powerofpeopleworld@gmail.com : jashim sarkar : jashim sarkar
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

সুখে থাকতে ভূতে কিলায়!

১. দেলোয়ার সাহেবের চলছিল ভালোই। বহুজাতিক কোম্পানির বড় চাকুরে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। অফিসের গাড়ি। সুন্দর ফ্ল্যাট। কোথাও কোনো খামতি নেই। কিন্তু তিনি চাইলেন তাড়াতাড়ি আরেকটু এগিয়ে যেতে। দু-একজন বন্ধুর পরামর্শে একটি ব্যবসায় কিছু টাকা লগ্নী করলেন। ছয় মাসের মাথায় আশাতীত লাভ। এরপর তিনি ব্যাংকের সমস্ত সঞ্চয় আর এর সঙ্গে অফিস থেকে বেশ কিছু টাকা অগ্রিম নিয়ে বড় অঙ্কের টাকা লগ্নী করলেন একই ব্যবসায়। কিন্তু এবার বিপদেই পড়ে গেলেন। পুরোটাই ক্ষতি। তার ওপর তিনি দেখলেন বন্ধুরা ব্যবসার কাগজপত্র বন্ধক নিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল, সেই ‘বন্ধু’রা এখন লাপাত্তা। অফিসের অগ্রিম শোধ আর ব্যাংকের দেনা মেটাতে গিয়ে তিনি প্রায় কপর্দকশূন্য। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গেও সারাক্ষণ খিটমিট লেগে থাকে।

২. সানিয়ার সমস্যাটা একটু অন্য রকম। বিয়ের বয়স ছয় বছর। স্বামী ব্যবসায়ী। বছর চারেকের একটি মেয়ে আছে তাঁদের। স্বামী-সন্তানের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক সানিয়ার। মাঝখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো সানিয়ার। সাধারণ কুশল বিনিময় দিয়ে শুরু। এরপর ছেলেটির সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়লেন প্রেমের সম্পর্কে! স্বামী যখন বিষয়গুলো জানতে পারলেন, তা নিয়ে সংসারে কুরুক্ষেত্র। দুজনের বিচ্ছেদ হয় হয় প্রায়। সানিয়া দুই-দুবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন।

দেলোয়ার আর সানিয়ার মতো সমস্যা অনেকেরই হয়। সুখী জীবনে তাঁরা একঘেঁয়ে বোধ করেন। আরও সুখ, বৈচিত্র্যময় সুখের খোঁজে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। শেষমেশ যেটুকু সুখ ছিল, তা-ও হারিয়ে ফেলেন তাঁরা।

সুখে থাকলেও বিভিন্ন কারণে মানুষের মনে অতৃপ্তি ভর করতে পারে। কখনো দেখা যায় চারপাশের নেতিবাচক মানুষেরা বুঝতেই দিচ্ছে না যে আপনি আসলে সুখে আছেন, শান্তিতে আছেন। তাঁরা আপনার ‘আছে’টাকে আড়াল করে ‘নাই’টুকুকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে দেখান। এই নেতিবাচক চিন্তার মানুষদের কারণে আপনি মনে করতে পারেন, ‘আরে, আমি তো সুখী নই।’ তখন আরও সুখ খুঁজতে গিয়ে বিপত্তি দেখা দেয়।

আবার কখনো নিজের প্রকৃত জীবনকে আরেকজনের ‘বিজ্ঞাপিত’ জীবনের সঙ্গে তুলনা করে কেউ কেউ সুখহীনতায় ভোগেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রত্যেকেই নিজের আলোকিত দিকটি তুলে ধরেন, সফলতার বয়ান করেন, হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেন। সেগুলো দেখে একজন সুখী মানুষ (যাঁর জীবনে সফলতা-ব্যর্থতা দুই আছে) ভাবেন, ‘আহা! অন্যরা আমার চাইতে কত সুখে আছে।’ কারণ তিনি তো ওই বিজ্ঞাপিত তথাকথিত সুখী মানুষের ব্যর্থতাটা জানেন না। এ সময় তিনি সেই হঠকারী বিষয়ে যুক্ত হয়ে আরও সুখী হতে চান। দিন শেষে ‘অসুখ’ তাঁদের ঘিরে ধরে।

সুখের সংজ্ঞা বুঝতে যখন অসুবিধা হয়, তখন তিনি সুখে থেকেও নিজের অন্তর্দৃষ্টির অভাবে অসুখী বোধ করতে থাকেন। কখনো কৌতূহলের বশে, একটু সাময়িক মজা পেতে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে ফেলেন, যা তাঁর সুখকে নষ্ট করে দেয়।

নিজের জীবনের জন্য নির্ধারণ করা লক্ষ্য যদি ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাতে থাকে, তখন অবস্থাটা হয় সেই তাঁতির মতো, যিনি তাঁত বুনে খুব ভালোভাবে সংসার চালাচ্ছিলেন। জীবনের লক্ষ্য বদল করায় তিনি তাঁত বিক্রি করে একটি এঁড়ে বাছুর কিনে দুধ দোয়াতে চাইলেন! কিন্তু এঁড়ে গরু তো আর দুধ দেয় না। এটি তিনি বুঝতে পারেননি। এরপর তিনি সেই এঁড়ে গরু দিয়ে চাষাবাদ করতে গেলেন। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে সব ফসল নষ্ট হলো। তাঁর তাঁত গেল, দুধ পেলেন না, ফসলও হলো না। তখন সবাই বলতে লাগল, ‘খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে, কাল হলো তার এঁড়ে গরু কিনে।’

কারও মধ্যে সুখী হওয়ার সব উপাদান থাকার পরও যদি তাঁর আবেগ, সময় আর সম্পদের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারেন, তখন তিনি নিজেকে অসুখী মনে করেন। তাঁর আবেগের অস্বাভাবিক প্রকাশ ঘটে, সময়ের সদ্ব্যবহার করতে পারেন না আর সম্পদের অপচয় করেন। নিজেকে সুখী থেকে অসুখীতে পরিণত করে ফেলেন।

কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত আর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে নিজের সুখটুকু নষ্ট করবেন না। আপনি যে সুখে আছেন, বিষয়টি বুঝতে পারাও একটা গুণ। এই গুণে গুণান্বিত হয়ে আপনি সুখে থাকুন, আশপাশের সবাইকেও সুখে রাখুন।

সুখের মধ্যে ‘ভূতের’ উপদ্রব থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন?

নিজের লক্ষ্য স্থির রাখুন। ঘন ঘন জীবনের মোড় পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না।

পরিবারকে সময় দিন। প্রিয়জনের সঙ্গে প্রতিদিন গুণগত সময় কাটান। পাশাপাশি প্রতিদিন একটু করে নিজেকে সময় দিন।

আপনার আশপাশে যদি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ বেশি থাকে, তবে তাদের এড়িয়ে চলুন। মলিন, বিষাদময় আবেগাক্রান্ত মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।

যে বিষয়টি সম্পর্কে আপনার স্বচ্ছ ধারণা নেই, সে বিষয়ে শ্রম বা অর্থ বিনিয়োগের আগে বিশদভাবে জানুন।

আরেকজনের সুখের সঙ্গে নিজেকে কখনোই তুলনা করবেন না। আপনি হয়তো তার অসুখী জীবনের গল্পটাই জানেন না।

একা থাকার অভ্যাস ছাড়ুন। উজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছল মানুষের সান্নিধ্যে বেশি বেশি থাকার চেষ্টা করুন।

নিজের ভেতরে যেসব গুণ আছে, আপনার জীবনের সেই মুক্তোদানাগুলো খুঁজে বের করুন। নিজের গুণের চর্চা করতে থাকুন।

আত্মসমালোচনা করুন, কিন্তু কখনোই আত্মগ্লানিতে ভুগবেন না। মাথা উঁচু করে বাঁচুন। সততা আর নৈতিকতাকে জীবনে সুখী থাকার অন্যতম উপাদান হিসেবে যুক্ত করুন।

খুব বেশি পেছনে ফিরে তাকাবেন না। মনে রাখবেন, আমাদের চোখ দুটো সামনে। সব সময় সামনের দিকে তাকাবেন। বর্তমানকে উপভোগ করবেন আর আগামী নিয়ে স্বপ্ন দেখবেন।

সফলতার মতো ব্যর্থতাও যে জীবনের এক অনুসঙ্গ, তা বুঝতে শিখুন। ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার চর্চা করুন।

যেকোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ (যেমন অযাচিত-অবাঞ্ছিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, মাদকের নেশা, ফাটকা ব্যবসা, জুয়া ইত্যাদি) এড়িয়ে চলুন।

শিশুদের ভালোবাসুন। আপনার সন্তানসহ সব শিশুকে ভালোবাসতে শিখলে সুখ আপনাকে ধরা দেবেই।

আহমেদ হেলাল: সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগ বিভাগ মনোরোগ বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

আরো পড়ুন