1. [email protected] : jashim sarkar : jashim sarkar
  2. [email protected] : mohammad uddin : mohammad uddin
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২, ১০:০৯ পূর্বাহ্ন

স্কুল ছুটির পর কাজ করে আমি ৩০ টাকা মজুরি পাই !

“HSC পরীক্ষায় বরিশাল বোর্ডে প্রথম হওয়াটা আমার কাছে ছিলো স্বপ্নের মত। কারণ আমি যেই গ্রামে থেকে পড়াশুনা করেছি সেখানে আজও বিদ্যুৎ যায়নি। সৌরবিদ্যুৎ আছে কয়েকটি ঘরে। টিভিতে বিটিভি ছাড়া আর কোনো চ্যানেল মানুষ দেখে না। শিক্ষার হারও খুব বেশি নয় এখনো। এরকম একটি এলাকায় সাইন্স নিয়ে পড়ালেখার কেউ সাহস করে না । আর আমি যখন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলে চান্স পেলাম তখন তো এলাকায় সাড়া পরে গেলো। কলেজে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিলো।

মাত্র ২ বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান ব্লাড ক্যান্সারে। আমার মা তখন আমাকে নিয়ে মামার বাসায় নিয়ে আসেন। ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে স্বরবর্ণ, ছোট খাট বাংলা কবিতা শেখাতেন। তাই শিশুশ্রেণী তে মাত্র ১৫ দিন ক্লাস করার পর স্যাররা আমাকে ক্লাস ওয়ানে পাঠিয়ে দেন। যার ফলাফল হিসেবে আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দেই তখন আমি ছিলাম ক্লাসে সবার ছোট। যেই স্কুলে এসএসসির সেরা রেজাল্ট ছিলো জিপিএ ৩.৭৮ সেখানে আমি গোল্ডেন এ প্লাস পাই।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার ফি ছিলো ৫০ টাকা। আমরা তখনো ছোট মামার সংসারের উপর নির্ভরশীল। ফি যেদিন লাগতো সেদিন মামার কাছে টাকা ছিলো না। এদিকে মার প্রচণ্ড জ্বর। মা এর ঔষধ কেনার টাকাটা পর্যন্ত ঘরে ছিলো না। পাশের বাসার একজন বললো তার সাথে তার ফসলের ক্ষেতে কাজ করলে সে ফি এর টাকা দিয়ে দিবে। স্কুল ছুটির পর কাজ করে আমি ৩০ টাকা মজুরি পাই। সেই টাকা জমা দিয়ে স্যারকে বললাম বাকি টাকা পরে দিব। স্যার বাকি টাকা মওকুফ করে দেন।

যখনই কোনো শিক্ষিত আত্মীয় স্বজন আসতেন আমার মা তাঁদের কাছ থেকে ইংলিশ কবিতার উচ্চারণ আর অর্থ জেনে লিখে রাখতেন আর পরে সেটা আমাকে সেটা শিখাতেন। একবার ক্লাস থ্রিতে সবার হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় জাতীয় পতাকা এঁকে আনতে হবে। কিন্তু রঙ পেন্সিল তো ছিলো না। মা পুঁইশাক ফল দিয়ে পতাকার লাল বৃত্ত রঙ করে দিয়েছিলেন।স্কুলে পড়ে যাওয়ার মত ভালো জামা ছিলো না আমার। যখন পিটি হত তখন আমি লুকিয়ে থাকতাম। কারণ পিটিতে সবার ড্রেস চেক করা হত। পিটি শেষ করে সবাই যখন ক্লাসে ঢুকতো তখন তাদের সাথে আমিও ক্লাসে ঢুকে যেতাম।

হাইস্কুল ছিলো অনেক দূর। ১০ টার ক্লাস ধরতে আমাকে ৭ টায় বাসা থেকে বের হতে হত। বর্ষা মৌসুমে একটা পলিথিনে কাপড় নিয়ে সাঁতার কেঁটে ক্লাস করতে হত। যেই শিক্ষক বাংলা পড়াতেন তিনিই সায়েন্সের বিষয়গুলা পড়াতেন। খুব সমস্যা হত পড়া বুঝতে। তবুও প্রতি পরীক্ষায় আমি প্রথম হতাম বিশাল ব্যবধানে। এসএসসি পরীক্ষা যখন নিকটবর্তী তখন বুঝতে পারলাম এভাবে পড়ালেখা করে তো পাশ করা যাবে না। তখন চেয়ারম্যান সাহেব এগিয়ে আসলেন। খুবই ভালো মনের মানুষ। তিনি পাশের শহরে আমার থাকা খাওয়া, পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেন, সব খরচ বহন করেন। এসএসসির ফিস ছিল ৩০০০ টাকা, সেই টাকা যোগাড় করাটা ছিল দুঃসাধ্য আমার জন্যে। চেয়ারম্যান সাহেবই তখন এগিয়ে এসে ফি পরিশোধ করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও যখনই পড়ালেখা বিষয়ক কোনো সমস্যায় পড়তাম আর্থিক হোক অথবা মানসিক হোক উনি সর্বদা আমাকে নিজের সন্তানের মতই দেখতেন।

আমি স্বপ্ন দেখি অনেক দূর যাওয়ার, মানুষের মত মানুষ হবার। এতদূর যে আসতে পেরেছি তার জন্যে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। চারিদিকের পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন পরিশ্রম এমন এক জিনিস যা মানুষের জীবনকে নিয়ে যেতে পাড়ে সাফল্যের চূড়ায়। বাঁধা বিঘ্ন তো জীবনে থাকবেই। কিন্তু সব বাঁধা পেরিয়ে সফল হবার মধ্যেই তো জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে আছে।”

Md. Imran Hasan

SSMC-45th Batch

আরো পড়ুন